ঢাকার হৃদপিণ্ডে অবস্থিত মহাখালীর কড়াইল বস্তি আবারও আগুনের দহনযন্ত্রণা দেখল। (২৫ নভেম্বর ২০২৫) বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে হঠাৎ করে বস্তির একাংশে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক তৈরি হয়। ঘরবাড়ি, দোকান, ছোট-খাট কারখানা—কিছুই রক্ষা পায়নি আগুনের লেলিহান শিখা থেকে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রথমদিকে এলাকার মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পানির বালতি, বালু ও প্রাথমিক উপকরণ দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু বস্তির সরু গলিপথ, গ্যাস লাইনের জটলা এবং টিন-কাঠের ঘরের ঘন উপস্থিতির কারণে আগুন দ্রুতই ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ফলে সাধারণ মানুষের চেষ্টা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ এনে দিতে পারেনি; বরং আগুন আরো ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ বিকেলেই আগুনের খবর পেয়ে প্রথমে ৭টি ইউনিট পাঠায়। পরে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠায় ধাপে ধাপে আরও ইউনিট যোগ করে মোট ১৬-১৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে পানির স্বল্পতা ও সংকীর্ণ পথ বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বস্তির ভেতরে ট্রাক প্রবেশে বাধা থাকায় ফায়ার সার্ভিসকে দীর্ঘ দূরত্ব থেকে পাইপ টেনে পানি আনা লাগছিল, যা সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে।
ফায়ার কর্মীরা প্রায় পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য যুদ্ধ চালান। রাত ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে পরিস্থিতি প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রণে আসে। এর কিছুক্ষণ পর পুরো এলাকা ধোঁয়া ও জ্বলন্ত আগুনের শেষ চিহ্ন মুছে যেতে শুরু করে।
ঘটনার পর পরই এলাকা পরিদর্শনে আসেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবক দল এবং উদ্ধারকর্মীরা। তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। আশ্রয়হীন মানুষদের জন্য সাময়িকভাবে মসজিদ, স্কুল এবং খোলা জায়গায় আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়।
এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হতাহতের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি, তবে বস্তির শতাধিক ঘর সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অনেক পরিবার তাদের সমস্ত সম্পদ, টাকা-পয়সা, জামা-কাপড়, কাগজপত্র—সবকিছু হারিয়েছে। রাতের শীত উপেক্ষা করে শিশু ও বয়স্করা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে।
একজন ক্ষতিগ্রস্ত মহিলা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমাগো ঘরটাও নাই, চালডালও নাই, বাচ্চাগুলার কাপড়ও সব আগুনে পুইড়া গেছে। এখন রাইতে কোথায় যামু?” এমন অসংখ্য পরিবার মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেছে।
বস্তির একাধিক জায়গায় এখনো দাহ্য টিন, কাঠ, ইলেকট্রনিকসের ভস্মীভূত গন্ধ ছড়িয়ে আছে। আগুনের তাপে গলিত লোহার কাঠামো আর কালো হয়ে যাওয়া ঘরের চিহ্ন মানবিক বিপর্যয়ের নির্মম ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে, আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে স্থানীয়দের অনেকে ধারণা করছেন, গ্যাস লাইনের ফুটো, বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট বা রান্নার চুলা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তদন্ত দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আগুনের উৎসের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে।
দুর্ঘটনার পর পুনর্বাসন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ পরিবারই দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্ট কর্মী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, যারা দিনে যা আয় করেন, তা দিয়ে পরিবার চালান। তাদের পুড়ে যাওয়া ঘর পুনর্নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি সাহায্য সংস্থা দ্রুত উদ্যোগ না নিলে মানবিক বিপর্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এ ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে বস্তি এলাকায় নিরাপত্তা মানদণ্ড। সরু পথ, খোলা বৈদ্যুতিক তার, গ্যাসের অবৈধ লাইন, দাহ্য উপকরণের আধিক্য—সব মিলিয়ে আগুন লাগলে বস্তি যেন পুড়ে যাওয়ার জন্যই প্রস্তুত থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, পরিকল্পিত ব্যবস্থা, নিরাপদ গ্যাস–বিদ্যুৎ সংযোগ এবং জরুরি রাস্তা তৈরি না করলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না।
মানুষ এখন অপেক্ষায় আছে—সরকার, প্রশাসন এবং মানবিক সংগঠনগুলো কিভাবে তাদের পাশে দাঁড়ায়। শীতের রাত আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে শতাধিক পরিবার আজ নিঃস্ব হয়ে নতুন আশার অপেক্ষায়।

