ঢাকা:
বিশ্ব রাজনীতি ক্রমেই সমঝোতার পথ ছেড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও শক্তির প্রদর্শনের দিকে এগোচ্ছে—এ ধারা ২০২৬ সালেও অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলাফল হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অস্থিতিশীলতা, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং নতুন ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদ বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও ২০২৬ সালে বিষয়টি নতুন করে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ব্রেট এইচ ম্যাকগর্ক এমন আশঙ্কার কথা জানান।
এআই ও তাইওয়ান ঘিরে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন
বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি ঘিরে প্রতিযোগিতা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মাত্রার উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে তাইওয়ান হয়ে উঠছে নতুন বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম নির্ধারক কেন্দ্র।
চীন ইতোমধ্যে তাইওয়ান ঘিরে বড় আকারের সামরিক মহড়া চালিয়েছে। খ্রিষ্টীয় নববর্ষের ভাষণে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, বেইজিং ও তাইওয়ানের একত্রীকরণ ঠেকানো সম্ভব নয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরান: অভ্যন্তরীণ সংকট ও বহুমাত্রিক চাপ
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি দাবি করেছেন, তাঁর দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইউরোপের সঙ্গে কার্যত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়িত। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি ইরান-ইরাক যুদ্ধের চেয়েও বেশি জটিল ও বিপজ্জনক।
এদিকে, ইরানে মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রার মূল্যপতনের প্রতিবাদে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে নতুন করে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রেট এইচ ম্যাকগর্কের মতে, ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা ও ইউরোপের অবস্থান
গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান প্রজেক্ট সিন্ডিকেট জানিয়েছে, নতুন বছরের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা ও বিভাজনকে আরও তীব্র করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন প্রযুক্তিগত ও সামরিক আধিপত্যের জন্য মুখোমুখি প্রতিযোগিতায় থাকবে, আর ইউরোপ চেষ্টা করবে তাল মিলিয়ে চলতে।
কানাডার দৈনিক দ্য ব্র্যান্ডন সান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৭৫ বছর ধরে বিশ্ব ব্যবস্থায় নেতৃত্ব দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র এখন ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ভূমিকা সংকুচিত করছে। ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রধান ইয়ান ব্রেমার এর কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বাজেটের চাপ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি সামনে আসছে বাজেট সংকট। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রাশিয়ার পরিকল্পিত সামরিক ব্যয় ছিল প্রায় ১৫.৫ ট্রিলিয়ন রুবল। আপাতত এই ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে বাজেটের ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।
ইউরোপ-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট
রাজনীতি বিশ্লেষক কাইল ভলপির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও শীতল হতে পারে। একই সঙ্গে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও যুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত বলে মত বিশ্লেষকদের।
সামনে কী?
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সাল হতে পারে বৈশ্বিক রাজনীতির মোড় ঘোরানোর বছর। চীন নিজেকে বহুপাক্ষিকতার নতুন গ্যারান্টার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করতে পারে। অন্যদিকে, আফ্রিকায় সুযোগের অভাব ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে জেনারেশন জেড-এর নেতৃত্বে সামাজিক বিদ্রোহের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।

